Recent Tube

তৈমুরের তান্ডব, বিবাদমান ওলামা ও ক্রন্দরত ইমামের খুতবা-- জিয়াউল হক।


   
 
         তৈমুরের তান্ডব, বিবাদমান ওলামা                          ও   ক্রন্দরত ইমামের খুতবা--!

       সেই ন্যাংড়া লোকটা এসেছিল দিল্লিতে। এসেছিল এক বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে, ২২ শে সেপ্টেম্বর শনিবার, ১৩৯৮, এসে থামলো সিন্ধু নদীর পাড়ে। দুই দিন ধরে চললো নৌকার সাথে নৌকা জোড়া দিয়ে ব্রিজ বানানোর কাজ। তার সে বাহিনী এতটা শক্তিশালী ছিল না যে, তারা ভারতের মত ধনাঢ্য দেশের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীকে মোকাবেলা করার সাহস করতে পারে। তারপরেও ন্যংড়া লোকটা জেনে শুনেই এসেছিল, সাহসও করেছিল।

    সাহস করার যথেষ্ঠ কারণও ছিল। প্রায় দশ বৎসর হলো সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ইন্তেকাল করেছেন। এর পরে এক এক করে রাজ্যের ক্ষমতা হাতে নিতে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ, সংঘাত আর ষড়যন্ত্র চলে আসছে। দিল্লির শাসন ক্ষমতায় আসীন সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুঘলক কোনো কুল কিনারা করতে পারছেন না। কে যে বন্ধু, আর কে দুশমন সেটাই তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে!

   প্রায় দশটা বৎসর কোনো শক্তিশালী সরকার দিল্লির ক্ষমতায় নেই। উজির-নাজির, সভাষদরা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। দেশ ও সমাজের উন্নতি বা নিরাপত্তার চিন্তা কারও মাথায় নেই। এমনতর খবর বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়েছে কান্দাহার, ইস্পাহান, সমরখন্দ আর মধ্য এশিয়ায়। মোঙ্গলরাও জানলো, শুনলো, প্রলুব্ধ হলো ভারত আক্রমণে ।

এর আগে তাদেরই পূর্বপুরুষ চেঙ্গিস খান ১২২১ খৃষ্টাব্দে এই সিন্ধুর তীর থেকেই ফেরত গেছে। সিন্ধুর পুব পাড়ে আর এগোয়নি। তারই বংশধর ন্যাংড়া লোকটা; তৈমুর লং এবারে তার দলবল নিয়ে নদী কেবল পারই হলো না, বরং সে ঝড়ের বেগে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব দিকে ছুটে চললো।

    চলার পথে যে জনপদই তার সামনে পড়লো সে জনপদকেই মাটির সাথে মিশিয়ে রক্তের বন্যা বইয়ে দিতে থাকলো। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ আর লুটতরাজ ছিল যথেচ্ছ! কেবলমাত্র সুস্থ ও সবল জোওয়ান পুরুষ, যাদের দাস হিসেবে বিক্রি করা যাবে, শেকলে বেঁধে নিয়ে চললো। এর বাইরে যারাই তার সামনে পড়লো নারী বৃদ্ধ শিশু, সবাইকেই তার তরবারির নীচে প্রাণ দিতে হলো।

    বলা হয়ে থাকে, লাশের পচা গন্ধ থেকে বাঁচতেই তৈমুরের সৈন্যরা দ্রুতবেগে এগিয়েছে! আর এভাবেই তারা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে দিল্লির দোরগোড়ায় হাজির! দিল্লির মসনদ নিয়ে তখনও আভ্যন্তরীণ যুদ্ধ সংঘাত চলছে বিভিন্ন দল আর উপদলে। 

    এরকমই একটা উপদলের নেতা, স্বঘোষিত সুলতান মাহমুদ শাহ বাছ বিচার না করেই তৈমুর লং এর সৈন্যবাহিনীর উপরে আক্রমণ করে বসে। ১৩৯৮ খৃষ্টাব্দের ১২ই ডিসেম্বর, বুধবার। মাত্র কয়েক ঘন্টায় সে আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয় তৈমুরের সেনাদল। তৈমুর কেবল তাতেই সন্তুষ্ঠ থাকে নি। তার সৈন্যদের আক্রমণ করা হয়েছে, এটা জানার পরে সে এতটাই ক্রোধান্বিত হয় যে, তৎক্ষণাৎ সে দিল্লিবাসীর উপরে এর প্রতিশোধ নেবার নির্দেশ দেয়।

     আহা কি করুণ দিন-ই না ছিল সে বুধবারটা! দিল্লিবাসীর উপরে নরক নেমে এসেছিল যেন। মাত্র একটা ঘন্টার মধ্যে দিল্লিতে পঞ্চাশ হাজার লোককে হত্যা করে তারা। এমনকি, তৈমুরের দলে অশিতীপর বৃদ্ধ ইমাম, যে নিজ হাতে তরবারিটাও ধরতে অক্ষম, সেই তাকেও বাধ্য করা হয়েছে বন্দী ভারতীয়র মাথা কাটতে!

     মাহমুদ শাহ পালিয়ে গেলেও অচিরেই তার প্রধানমন্ত্রী মালু খান-এর নেতৃত্বে দশহাজার অশ্বারোহী, চল্লিশ হাজার পদাতিক এবং বিরাট এক হস্তিবাহিনী নিয়ে আবারও মাঠে আসলেন, কিন্তু এবারেও তারা সফল হলো না। কারণ, ঐ যে, নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, দ্বন্দ আর বিদ্বেষ!

    ফলাফল কি হলো? তৈমুর লং এর এক একজন সৈন্য গড়ে প্রায় কুড়িজন ভারতীয়কে শেঁকলে বেঁধে বন্দী হিসেবে ক্যাম্পে আনলো। সারা রাত ধরে দিল্লির প্রতিটি অলিতে গলিতে, বাড়িতে বাড়িতে চললো লুটতরাজ আর ধর্ষণ! লাশের পর লাশ দিল্লির পথে ঘাটে, যেখানে সেখানে পড়ে থাকলো! প্রচন্ড শীতের মধ্যেও সেই সব লাশে পচন ধরতে শুরু করলে গন্ধে টেকা দায় হয়ে উঠলো! শেষ পর্যন্ত আর টিকতে না পেরে প্রায় নয়দিন পর দশম দিনে তৈমুর তল্পিতল্পা গুটাতে শুরু করলো।

     আসার সময় তারা ঝড়ের বেগে এসেছিল পেছনে পচা লাশের গন্ধের হাত থেকে বাঁচার জন্য। যাবার সময়ও ঠিক সেই একই অবস্থা, বাতাসে লাশের পচা গন্ধ ! কিন্তু তৈমুরের সেনাবাহিনী দিনে চার মাইলের বেশি এগুতে পারেনি!  কারণ, তারা দিল্লি থেকে এত সম্পদ লুট করেছে যে, তাদের ঘোড়াগুলোও সে সম্পদ টেনে নিতে হিমশিম খেয়েছে! দিল্লি ও আশে পাশে এতটাই দুর্গন্ধ ছড়িয়েছিল যে, ঐ দুই মাসে দিল্লির আকাশে একটা পাখিও ওড়েনি! এসবই দু:সহ স্মৃতি।

      আরও একটা স্মৃতি আছে বটে! তৈমুর লং এর সেই বৃদ্ধ ইমাম, যে মানুষ হত্যা করতে না চাইলেও তাকে দিয়ে জোর করে ভারতীয় বন্দীর মাথা কাটানো হয়েছে, সেই বৃদ্ধ ইমাম ১৪ই ডিসেম্বর শুক্রবার দিল্লির মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ান। সেখানে তিনি দিল্লিজয়ী তৈমুর লং এর নামে খুতবাও দেন। সেই খুতবায় তার তৈমুর লং এর প্রশংসা করে খুতবা দিয়েছিলেন, তা স্মৃতি নয়।

    স্মৃতি হলো, তিনি তার সেই খুতবায় অশ্রুসিক্ত নয়নে কম্পিত কন্ঠে বলেছিলেন; যে জাতি আল্লাহর অবাধ্য হয়, যে জাতি আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলীতভাবে আঁকড়ে ধরে না, তার পাবন্দী করে না, সেই জাতির উপরে আল্লাহ আজাব নাজিল করেন। আর আল্লাহর আজাব যখন আসে, তখন তা হতে পালিয়ে বাঁচার কোনো পথ থাকে না। আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউ বাঁচতে পারে না।

     ইতিহাস স্বাক্ষী। স্বাক্ষী এই জনপদ, এমনকি, আমরা এই বঙ্গবাসী সকলেই। দিল্লিবাসী সেদিন সেই খুতবা থেকে শিক্ষা নেয়নি, আমরাও সে খুতবা আর সেই করুণ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেইনি, আজ অব্দি নয়! বেমালুম ভুলে গেছি! বিবাদমান ওলামাদের বিতর্ক উপভোগে আছিও বেশ!

    এখন অপেক্ষা কেবল সেই ভয়াবহ সময়টুকুর, কখন আল্লাহর আজাব আচমকা এসে ঘেরাও করবে আর আমাদেরকেও সেদিনকার সেই দিল্লিবাসীর মত এক কলংকিত ও ভয়াবহ ইতিহাসের অংশ বানিয়ে রেখে যাবে আগামি প্রজন্মের জন্য, একটা ঐতিহাসিক উদাহারণ হিসেবে! অপেক্ষা কেবল সময়ের!!
------------------------------------------------
লেখকঃ ইসলামি চিন্তাবিদ গ্রন্থপ্রনেতা ও বিশ্লেষক।         

Post a Comment

0 Comments