জকিগঞ্জের মতিনাইন
-----------------------
বাংলা বা ইংরেজিতে দ্বি-বচন না থাকলেও আরবী ব্যাকরণে দ্বি-বচন রয়েছে, যা দুজন ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝায়। একবচন শব্দের শেষে ‘আইন’ এর মতো করে যুক্ত করলে দ্বি-বচন হয়। যেমন কিতাব এর দ্বি-বচন কিতাবাইন। হযরত উসমান (রা.) কে বলা হতো ‘জিন্নুরাইন’। এই উপাধিও দ্বি-বচন। জিন্নুরাইন অর্থ "দুই আলোর অধিকারী" বা "দুই জ্যোতির স্বামী"। মহানবীর দুই মেয়েকে (একজনের মৃত্যুর পর আরেকজন) বিয়ে করার সৌভাগ্য হয়েছিলো বলে তাঁকে জিন্নুরাইন বলা হয়। মতিন শব্দের দ্বি-বচন আরবীতে আছে কিনা জানিনা, তবে গঠন কাঠামো ধরলে দুই মতিন হবে ‘মতিনাইন’। (Abu Affan comments, আরবি ভাষায় একবচনের শেষে আলিফ নুন বা ইয়া নুন বৃদ্ধি করে দ্বি-বচন করতে হয়।)
সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণকারী দুই কৃতিসন্তানের কথা সংক্ষেপে লিখবো, যে দুই জনের নাম হচ্ছে মতিন, অতএব মতিনাইন। একজনের নাম মতিন উদ্দিন আহমদ, আরেকজনের নাম মোঃ আব্দুল মতিন। দুই মতিনই তাঁদেরকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, কিন্তু সেই অনুযায়ী তাঁদের পরিচিতি ও মূল্যায়ন কম, বিশেষ করে নিজ উপজেলায়। জকিগঞ্জের এই প্রজন্মের অনেকেই হয়তো এই দুই মতিনের নামই জানেনা। অথচ তাঁদের একজন এখনো জীবিত আছেন, আরেকজন অনেক আগে ঘাসের নিচে চলে গিয়েছেন।
ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দিন আহমদের জন্ম আটগ্রাম এলাকায়। তিনি মারা গেছেন ২০০০ ইংরেজিতে বা আরো আগে। তাঁর সঠিক মৃত্যুর সন যেমন জানতে পারিনি, তেমনি তাঁর সঠিক জন্মসালও জানা সম্ভব হয়নি। এক বিবরণে পাই ১৯০০ সালে তাঁর জন্ম, আরেক বিবরণে ১৯৩১। তবে গত শতাব্দীর শুরুর দিকে যে জন্ম—এটা বলা যায়। উনার জন্ম ও মৃত্যু সাল সম্পর্কে কারো জানা থাকলে জানাবেন প্লিজ।
ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে একটা যৌক্তিক পরিণতির দিকে যায়। কিন্তু এরও কয়েক বছর আগে সিলেট রোপিত হয়েছিলো সেই আন্দোলনের বীজ। এর নেপথ্য কারিগর ও অন্যতম সংগঠকদের মধ্যে জকিগঞ্জের কৃতিসন্তান মতিন উদ্দিন আহমদও ছিলেন। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সিলেটে প্রথম যে সভা হয়, সেথায় সভাপতিত্ব করেন মতিন উদ্দিন আহমদ। সরকারী চাকুরী থেকেও তিনি ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। লেখালেখি ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর বেশ অনুরাগ ছিলো। ফলে তিনি সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) ও আরো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি একজন সামাজিক ও সাংস্কৃতির ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
মতিন উদ্দিন আহমদ একজন শৌখিন সংগ্রাহকও ছিলেন। তাঁর সংগৃহীত চার হাজারেরও বেশি দুর্লভ নিদর্শন নিয়ে সিলেট নগরীল দরগাহ গেট সংলগ্ন কেমুসাসে একটি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে। জাদুঘরটি তাঁরই নামে নামকরণ করা হয়েছে। সেই জাদুঘরে জকিগঞ্জ এলাকার এক সময়ের মানুষ বিক্রিরও দলীল সংরক্ষিত রয়েছে। এই মূল্যবান দলীলটি মতিন উদ্দিন আহমদের সংগ্রহে ছিলো। এই জাদুঘরে এমন আরও অনেক মূল্যবান দলিল, স্মারক ও নিদর্শন রয়েছে। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘরের খবর আমরা জানিই না, কখনো যাইনি অনেকে, আমিও যাইনি, আগামী বার সিলেট গেলে যাবো।
এবার আসি জীবন্ত কিংবদন্তি বিচারপতি আব্দুল মতিনের কথায়। বাংলাদেশের একজন সেরা সংবিধান বিশেষজ্ঞ। আইন ও সংবিধানের উপর তার দখল প্রচুর। তিনি খুবই মূল্যবান কয়েকটি বই লিখেছেন যা আইন অঙ্গনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-- 1. The Unwritten Constitution of Bangladesh, 2. A Tale of two Supreme Courts, 3. The Quran, its morals and Laws with glimpses of Islamic Jurisprudence. আইনের পাশাপাশি কুরআন নিয়েও তাঁর প্রচুর স্টাডি রয়েছে। তিনি খুবই জানাশোনা একজন কৃতি পুরুষ।
বিচারপতি আব্দুল মতিন ছিলেন সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন সিনিয়র বিচারক। তিনি ছিলেন অনন্য বিচারক। তাঁর লেখা রায় অসাধারণ। তাঁর মতো আইন সম্পর্কে এত গভীর জ্ঞানের অধিকারী বিচারপতি সহজে জন্মাবে না। এই গুণী বিচারপতি ১৯৪৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর জকিগঞ্জের খলাছড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেটের জেলা বারের তালিকাভূক্ত আইনজীবি ছিলেন। একটা পর্যায়ে হাইকোর্টের বিচারপতি হন, এবং পরবর্তীতে আপিল বিভাগের বিচারপতি হন। বিচারপতি থাকাকালীন তিনি অনেক বড় বড় ও আলোচিত রায় প্রদান করেন।
বিচারপতি আব্দুল মতিনের ছেলে ছেলে মনজুর আল মতিনও একজন আইনজীবি। আইন পেশার পাশাপাশি তিনি টিভিতে সংবাদ পাঠ করেন ও টকশো উপস্থাপনা করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানজুর আল মতিনের ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিলো। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায় হলেও তাঁর পিতা বিচারপতি আব্দুল মতিনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা জকিগঞ্জে। এই প্রজন্মের উচিত- বিচারপতি আব্দুল মতিনকে জানা, তাঁকে মূল্যায়ন করা।
#এহসানুল হক জসীম
৩ মার্চ ২০২৬

0 Comments